
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। বছরের প্রথম দিনটিকে ঘিরে আমাদের আবেগ, আনন্দ আর ঐতিহ্য যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। কিন্তু এই উৎসবটা কীভাবে এলো? বাংলা সনের ইতিহাস আসলে কী? চলুন, সহজ ভাষায় সেসব কথা বলি।
বাংলা সন এলো কীভাবে?
আমরা অনেকেই শুনেছি, সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেছিলেন। কথাটা পুরোপুরি সঠিক, তবে পুরো গল্পটা একটু বড়।
ষোলশ শতকের কথা। তখন মুঘল সাম্রাজ্যে হিজরি সন চলে, যা চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চন্দ্র বছরের দিন সংখ্যা সৌর বছরের চেয়ে প্রায় এগারো দিন কম। ফলে কর আদায়ের তারিখ প্রতি বছর ঘুরে যেত। কৃষকেরা তখন করের চাপে পড়তেন—ফসল তোলার আগেই টাকা দিতে হতো, যা ছিল খুব কষ্টকর।
এই সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবর তাঁর জ্যোতির্বিদ ফতহুল্লাহ সিরাজিকে দিয়ে নতুন একটি পঞ্জিকা তৈরি করান। হিজরি ও সৌর পদ্ধতির মিশেলে তৈরি হয় ‘ফসলি সন’, যা পরবর্তীতে ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিত পায়। ১৫৮৪ সালে চালু এই পঞ্জিকা মূলত কৃষি ও কর আদায়ের কাজে ব্যবহৃত হতো।
তবে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু বিতর্ক আছে। কেউ কেউ বলেন, বাংলা সন আকবর নয়, সুলতানি আমলের হোসেন শাহের সময় থেকেই চালু ছিল। আবার অনেকে মনে করেন, মুর্শিদাবাদের নওয়াবদের আমলেই এটি প্রশাসনিক স্বীকৃতি পায়। কিন্তু ব্যাপারটা যাই হোক না কেন, বাংলা সনের সঙ্গে কৃষি ও অর্থনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, সেটা সবারই জানা।
পহেলা বৈশাখে কী হতো আগে?
বাংলা সনের প্রথম দিনটির নাম পহেলা বৈশাখ। শুরুতে এটি ছিল সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক দিন। ব্যবসায়ীরা এই দিনে পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন। ‘হালখাতা’ বলতে আমরা আজও সেটাকেই বুঝি। জমিদাররাও এদিন প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন, বকেয়া খাজনা আদায় করতেন।
গ্রামাঞ্চলে আবার অন্য চিত্র। মহিলারা ভিজিয়ে রাখা চাল আর আমের ডালপালা দিয়ে ছোটখাটো আচার করতেন। ‘আমানি’র মতো কিছু রীতি ছিল অশুভ শক্তি দূর করতে। উৎসব বলতে তেমন জাঁকজমক ছিল না। ছিল কৃষিজীবী মানুষের সরল আনন্দ।
ব্রিটিশ আমলে বাংলা সনের প্রশাসনিক গুরুত্ব কমে গেলেও মানুষের জীবনে এর জায়গা অটুট থাকে। কৃষিকাজ, বিবাহ, উৎসব— এসবের সময় নির্ধারণে বাঙালি তখনও এই পঞ্জিকাকেই অনুসরণ করত।
কীভাবে এলো উৎসবের রূপ?
পহেলা বৈশাখ আজকের মতো জমকালো উৎসবে পরিণত হলো তুলনামূলকভাবে অনেক পরে। এর পেছনে রয়েছে বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও লেখা বাংলা নববর্ষকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। তিনি প্রকৃতি ও ঋতুর সঙ্গে উৎসবকে যুক্ত করেন।
সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে প্রথমবারের মতো সূর্যোদয়ের সময় বর্ষবরণের আয়োজন করে। তার আগে ১৯৫১ সালে ‘লেখক-শিল্পী মজলিশ’ ঢাকার ওয়ারিতে গণউদযাপনের সূচনা করে।
এরপর ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখের সঙ্গে যুক্ত হলো লাল-সাদা পোশাক, পান্তা-ইলিশ আর মুখে ‘শুভ নববর্ষ’ বলার রীতি। মজার ব্যাপার হলো, লাল-সাদা পোশাকের চল খুব বেশি পুরনো নয়—এটি গণমাধ্যম ও শহুরে সংস্কৃতির হাত ধরেই এসেছে। পান্তাভাত কৃষকের প্রাত্যহিক খাদ্য থেকে উৎসবের পদে উন্নীত হয়েছে।
মো. আল আমিন, শিক্ষার্থী: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।