
সম্পাদকীয় ডেস্ক, কথা২৪ | ঢাকা প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬
**ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে** বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা, যার ফলে তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ার জন্য সরকার দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত শনিবার রাতে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে যে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন এবং পেট্রলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সরকারি পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে 'অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ এড়ানোর কৌশল' বলা হলেও সাধারণ মানুষের মনে এ মুহূর্তে একটি প্রধান প্রশ্ন উঠেছে—যে হারে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, তারা কীভাবে এ চাপ মোকাবিলা করবে?
**জনজীবনে ‘অশনিসংকেত’** আমাদের দেশে জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশ পূরণ হয় ডিজেলের মাধ্যমে। নতুন সিদ্ধান্তে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় একটি গুরুতর সংকেত। এর ফলে:
পরিবহন ব্যয়: বাস ও ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধির ফলে সাধারণ যাত্রীদের পকেটে তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাব ফেলবে।
কৃষি ও সেচ: কৃষকদের সেচযন্ত্র ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন খরচ বাড়লে চাল-ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম আবারও বাড়তে পারে।
পণ্য পরিবহন: ট্রাক ভাড়া বাড়ানোর কারণে বাজারে পণ্যদ্রব্যের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
**সরকারের নীতি ও অব্যবস্থাপনা** নতুন ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার শুরু থেকেই তেলের দাম না বাড়ানোর ‘অপেক্ষা করার নীতি’ গ্রহণ করেছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়ায় তাদের শেষ পর্যন্ত দাম বাড়াতে বাধ্য হতে হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—যদিও তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবী করা হচ্ছে, তবুও ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি ও তেলের সংকট কেন? সরবরাহ ব্যবস্থায় এই তীব্র অব্যবস্থাপনা সরকারকে বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।
এছাড়া সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ যেমন—সন্ধ্যার পর শপিং মল বন্ধ করা বা ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ চালুর বিষয়গুলোতে সরকার যথেষ্ট দেরিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি সময়মতো এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হতো, তবে হয়তো মাঠ পর্যায়ে তেলের মজুতদারি রোধ করা সম্ভব হতো।
**প্রাপ্তি ও ভোগান্তির দোলাচল** দাম বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু এতে কি তেলের প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে? ফিলিং স্টেশনগুলোতে সাধারণ মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি কি দূর হবে? মূল্যবৃদ্ধির ফলে যে নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতি সরকারের কোন সহানুভূতি নেই। ইতিমধ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছে। এর ওপর তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
**কথা২৪-এর পর্যবেক্ষণ** সরকারকে কেবল দাম বাড়িয়েই দায় সারতে হবে না; বরং নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে জরুরি নজর দিতে হবে: ১. বাজার তদারকি: তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে যাতে ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সেজন্য কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। ২. ডিজিটাল পদ্ধতি: কিউআর কোড বা ডিজিটাল ফুয়েল পাস দ্রুত কার্যকর করে তেলের কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি বন্ধ করতে হবে। ৩. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: জ্বালানি নীতিতে কেবল আমদানিনির্ভরতা পরিত্যাগ করে নিজেদের অনুসন্ধান ও বিকল্প জ্বালানির প্রয়োজন রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষকে রক্ষায় কেবল ‘যৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির’ দোহাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ ও জনবান্ধব প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
কথা২৪/বিভাগ: সম্পাদকীয়/জাতীয়
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।