
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ | ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ঢাকা: শোক আর গর্বের এক অনন্য আবহে আজ সারা বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারসহ সারা দেশের প্রতিটি শহিদ মিনারে নেমেছে মানুষের ঢল। হাতে ফুলের তোড়া আর কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’—এই কালজয়ী গান গেয়ে জাতি স্মরণ করছে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী বীর সন্তানদের।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন
রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহিদদের প্রতি প্রথম শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এরপর একে একে মন্ত্রীসভার সদস্য, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ভাষা আন্দোলনের বীর শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
প্রভাতফেরিতে মানুষের ঢল
ভোর হওয়ার সাথে সাথেই সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে শুরু হয় প্রভাতফেরি। আজ সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থান ও কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকায় নামে হাজারো মানুষের মিছিল। অনেকের পরনে ছিল সাদা-কালো পোশাক, যা শোক ও শক্তির প্রতীক। খালি পায়ে হেঁটে আবালবৃদ্ধবনিতা ভাষা শহিদদের বেদিতে অর্পণ করেন ভালোবাসার ফুল। শিশুদের কলকাকলি আর বড়দের গম্ভীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ।
অমর একুশের গুরুত্ব ও ইতিহাস
১৯৫২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল বাংলার ছাত্রসমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। রাজপথ রঞ্জিত হয় বাঙালির রক্তে। সেই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছিল বাংলার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে আজ সারা বিশ্বে ১৯০টিরও বেশি দেশে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে।
সারা দেশে অনুষ্ঠানমালা
দিনটি উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও আয়োজিত হয়েছে আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলায় আজ দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়। লেখকদের লেখায় এবং পাঠকদের উপস্থিতিতে অমর একুশের চেতনা যেন এক নতুন রূপ ধারণ করেছে।
একুশের চেতনা ও বর্তমান অঙ্গীকার
একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি দিন নয়, বরং এটি বাঙালির অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। উপস্থিত বিশিষ্টজনরা বলছেন, কেবল দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হোক আজকের শপথ। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলো রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
আজকের এই দিনে সারা বাংলাদেশ এক সুরে বলছে— "যতদিন থাকবে এই বাংলা ভূমি, ততোদিন অম্লান থাকবে ভাষা শহিদদের স্মৃতি।"
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।