
বাংলাদেশের রাজনীতি কখনোই সরলরৈখিক নয়। এখানে ইতিহাস সোজা পথে হাঁটে না; ইতিহাস হাঁটে বাঁক নিয়ে, কখনো থেমে যায়, কখনো হোঁচট খায়, আবার কখনো আচমকা দৌড় দেয়। এই রাজনীতিতে সময় কথা বলে প্রতীকের ভাষায় আর কোনো কোনো মানুষের ব্যক্তিগত জীবন হয়ে ওঠে জাতির রাজনৈতিক উপাখ্যানের অংশ। কখনো একটি পরিবারের গল্পই হয়ে যায় একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার ইতিহাস, প্রতিরোধের দলিল কিংবা স্বপ্নভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস। ঠিক এমনই এক রাজনৈতিক উপাখ্যানের নতুন অধ্যায়ের সম্ভাব্য সূচনা ২৫ ডিসেম্বর—দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ক্ষণ। এটি নিছক একটি ব্যক্তির দেশে ফেরা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সময়ের আত্মসমালোচনা, একটি জাতির প্রত্যাশার পুনর্জন্ম এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনার এক নীরব কিন্তু গভীর সংকেত। এ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের স্মৃতি, দলের ইতিহাস এবং জনমানুষের বহুদিনের প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি আবারও সহনশীল রাজনীতির পথে ফিরতে পারবে? রাজনীতি কি আবার জনতার কথা শুনবে, নাকি ক্ষমতার ভাষাতেই বন্দি থাকবে?
নির্বাসন শব্দটি শুধু ভৌগোলিক বিচ্ছেদের নাম নয়। এটি আত্মপরিচয়ের সঙ্গে দূরত্ব, স্মৃতির সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং প্রতিদিনের জীবনে দেশের অনুপস্থিতির এক দীর্ঘশ্বাস। নিজের মাটি, নিজের ভাষা, নিজের মানুষের ভিড়—সবকিছুর বাইরে দাঁড়িয়ে জীবন কাটানোর নামই নির্বাসন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—নির্বাসন বহু নেতাকে ভেঙে দিয়েছে, আবার কাউকে কাউকে ইতিহাসের উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
তারেক রহমানের জীবনও গত দেড় দশক ধরে সেই দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। প্রতিটি সকাল শুরু হয়েছে বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, অথচ প্রতিটি রাত শেষ হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি ভেবে।
২০০৮ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার জীবন এক অনিশ্চিত পথে মোড় নেয়। ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল জরুরি অবস্থার শাসনে আবদ্ধ। তখন রাজনীতি ছিল নিয়ন্ত্রিত, সংবাদ ছিল ভীত, রাজপথ ছিল নীরব। সেই প্রেক্ষাপটে মামলা, গ্রেপ্তার, চিকিৎসাজনিত বিদেশযাত্রা এবং পরে দীর্ঘ অবস্থান—সব মিলিয়ে তারেক রহমান ধীরে ধীরে পরিণত হন বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত নির্বাসিত নেতায়। রাষ্ট্রীয় বয়ানে তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত; রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি নিপীড়িত আর তার সমর্থকদের কাছে তিনি প্রতিরোধের প্রতীক। এই বহুমাত্রিক পরিচয়ই তারেক রহমানকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক নেতার গণ্ডি ছাড়িয়ে ইতিহাসের চরিত্রে রূপ দিয়েছে। কেউ তাকে দেখেছে অপরাধের দায়ে দণ্ডিত নেতা হিসেবে, কেউ দেখেছে ষড়যন্ত্রের শিকার উত্তরাধিকার হিসেবে। এ দ্বন্দ্বই তাকে ঘিরে রাজনীতির আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর।
নির্বাসনের এ সময়টি শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষয় নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সংকটের সময়ও বটে। বিএনপি তার অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বকে হারিয়ে পড়ে এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তায়। মাঠের রাজনীতিতে তৈরি হয় শূন্যতা, নেতৃত্বে আসে বিভ্রান্তি, কর্মীদের মধ্যে জমে ওঠে হতাশা।
লন্ডন—একটি শহর, যেখানে থেকে তিনি দেখেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির উত্থান-পতন, আন্দোলনের ঢেউ, নির্বাচনের বিতর্ক, রাজপথের রক্ত আর গণতন্ত্রের দীর্ঘ নীরবতা। লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হয়তো তিনি শুনতে পারেননি বাংলাদেশের মিছিলের স্লোগান, কিন্তু তার কানে বাজত ঢাকার রাজপথের প্রতিধ্বনি।
প্রবাসের জীবন কখনোই রাজনীতিকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন স্বস্তির নয়; এটি বরং প্রতিদিনের অপরাধবোধ—দেশে থাকতে না পারার বেদনা, দলের পাশে না দাঁড়াতে পারার যন্ত্রণা। দেশের বাইরে থেকেও তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন—এটি যেমন বিস্ময়কর, তেমনি কষ্টসাধ্য। প্রযুক্তিনির্ভর এ নেতৃত্বে ছিল দূরত্বের সীমা, কিন্তু ছিল দৃঢ়তা। এ সময় বিএনপি ছিল দমনপীড়নে বিপর্যস্ত, নেতাকর্মীরা মামলার ভারে ন্যুব্জ, রাজপথ ছিল অনিরাপদ। দলীয় কার্যালয়গুলো কার্যত অবরুদ্ধ, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ কিংবা বাধাগ্রস্ত। এমন বাস্তবতায় তারেক রহমান ভার্চুয়াল নেতৃত্বের এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেন। নির্দেশনা, বার্তা, কৌশল—সবকিছুই এসেছে দূরত্বের ভেতর দিয়ে। এ নেতৃত্বে যেমন ছিল সীমাবদ্ধতা, তেমনি ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক ধৈর্য ও স্থৈর্য, যা তাকে দলের জন্য অপরিহার্য করে তোলে। বিএনপির ভেতরে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হলেও তারেক রহমান ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। নেতাকর্মীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আশার নাম—দূরে থেকেও যিনি দলের হাল ধরেছেন।
বিশেষত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি হয়ে ওঠেন দলের মুখপাত্র। তার কণ্ঠে রাজনীতির ভাষা ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা এক নেতার ভাষায়—যেখানে ক্ষোভ আছে, আছে আশা, আছে ফিরে আসার আকুতি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যা নির্ধারণ করে দেয়। তেমনি ২৫ ডিসেম্বর ধীরে ধীরে একটি তাৎপর্যময় রূপ নিচ্ছে।
২৫ ডিসেম্বর—তারেক রহমানের দেশে ফেরার সম্ভাব্য দিন—কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি বহু মানুষের অপেক্ষার দিন। এটি সেই দিন, যেদিন বিএনপির নেতাকর্মীরা আবারও একজন দৃশ্যমান নেতৃত্ব দেখতে চায়, যেদিন রাজনীতি নতুন করে উত্তাপ পেতে পারে। এই দিনটি কেবল বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হতে পারে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার ভেতর একটি নীরব মোড়। একটি মুহূর্ত, যেখানে রাজনীতি হয়তো নতুন ভাষা খুঁজবে।
এই প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য বহুমাত্রিক—
এটি বিএনপির জন্য নেতৃত্বের দৃশ্যমান পুনর্গঠন।
এটি বিরোধী রাজনীতির জন্য নতুন গতি ও সাহস।
এটি রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতার এক বড় পরীক্ষা।
এবং সর্বোপরি, এটি জনমানুষের মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত।
২৫ ডিসেম্বর তাই কেবল একটি দিন নয়; এটি রাজনৈতিক সময়ের একটি মানসিক প্রস্তুতির নাম।
তারেক রহমানকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন গভীর, তেমনি সংশয়ও প্রবল। বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে রাজনীতিকে দেখেছে সংঘাত, মামলা, গ্রেপ্তার আর বিভক্তির গল্প হিসেবে। এ ক্লান্ত জনতার মনে তাই নতুন নেতৃত্ব মানেই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়—রাজনীতির ভাষা বদলের আকাঙ্ক্ষা।
বিএনপির সমর্থকদের কাছে তিনি ভবিষ্যতের নেতা—যিনি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করবেন, যিনি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে আধুনিক সময়ের ভাষায় উপস্থাপন করবেন। তাদের চোখে তিনি সাহসের নাম, প্রতিরোধের নাম, প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।
কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিক সমাজের প্রশ্নগুলোও স্পষ্ট। দীর্ঘদিন রাজনীতির কেন্দ্রের বাইরে থাকা একজন নেতা কি দ্রুত মাঠের বাস্তবতা বুঝতে পারবেন? তিনি কি কেবল দলীয় রাজনীতির ভাষায় কথা বলবেন, নাকি রাষ্ট্রের কথা বলবেন? অতীতের বিতর্ক ও অভিযোগের বোঝা কি তিনি নামিয়ে রেখে সামনে তাকাতে পারবেন? বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম—যারা রাজনীতিকে দেখে চাকরি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চোখ দিয়ে—তারা তারেক রহমানের কাছে চায় স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। তারা শুধু বিরোধী কণ্ঠ নয়, চায় একটি বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তা।
রাষ্ট্রের সামনে আয়না
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন রাষ্ট্রকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং ন্যায়বিচারের অনুভূতি। একজন নির্বাসিত নেতার নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিপক্বতার সূচক হয়ে উঠতে পারে। এখানে প্রশ্ন শুধু ব্যক্তি তারেক রহমানের নয়; প্রশ্ন রাষ্ট্র তার বিরোধী কণ্ঠকে কতটা সহনশীলভাবে গ্রহণ করে। যদি এ প্রত্যাবর্তন সংঘাতহীন হয়, তবে তা শুধু একটি দলের জয় নয়—এটি হবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সক্ষমতার প্রমাণ।
ইতিহাস বলে, নির্বাসন থেকে ফেরা নেতাদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে—প্রতিশোধের রাজনীতি অথবা পুনর্মিলনের রাজনীতি। তারেক রহমানের সামনে সেই একই প্রশ্ন। যদি তিনি অতীতের ক্ষত উসকে দিতে চান, তবে রাজনীতি আবারও প্রতিহিংসার বৃত্তে ঘুরবে। কিন্তু যদি তিনি দীর্ঘ নির্বাসনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পথে হাঁটেন, তবে তিনি কেবল দলের নেতা নন—জাতির নেতা হয়ে উঠতে পারেন।
২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরা যদি তা বাস্তবে রূপ নেয়—তবে সেটি হবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ, কিন্তু শেষ অধ্যায় নয়। আসল প্রশ্ন, এ প্রত্যাবর্তন দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তারিখ মনে রাখে না, মনে রাখে দায়িত্ব। জনতা ব্যক্তিকে নয়, তার কাজকে বিচার করে। তারেক রহমান যদি দীর্ঘ নির্বাসনের অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় রূপ দিতে পারেন, তবে এ প্রত্যাবর্তন কেবল বিএনপির জন্য নয়; পুরো বাংলাদেশের জন্যই হতে পারে এক নতুন সম্ভাবনার সূচনা।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সেই সন্ধিক্ষণে ২৫ ডিসেম্বর হতে পারে সময়ের এক নীরব ঘণ্টাধ্বনি, যা মনে করিয়ে দেবে রাজনীতির রাত যত দীর্ঘই হোক, ভোর আসার আশা কখনো নিঃশেষ হয় না।
লেখক: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।